jatishwor wallpaper news logo
অরিত্রি অধিকারী নামে এক কোমলমতি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে খুব দ্রুতই জল গড়িয়েছে অনেক দূর। বিষয়টিকে নিয়ে বরাবরের মত এবারো সুশীলরা সাময়িকভাবে সরব সোশাল মিডিয়ায়।কিন্তু উত্তেজনার পারদ শীর্ষে না উঠিয়ে ঠান্ডা মাথায় ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ামকগুলো বুঝতে বা খুঁজতে অনেকেরই যে অনীহা রয়েছে তা চলমান ঘটনা প্রবাহ থেকে সহজেই প্রতিয়মান হয়।
সরকারের কার্যকর ও  আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নকল নামক বিষবৃক্ষ অনেকাংশেই উৎপাটন করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার অনেক আগেই বেত উঠিয়ে দিয়েছে।এটা অবশ্যই একটি ভাল পদক্ষেপ ছিল।কারন জোর করে বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করে শিক্ষাদান শিক্ষকের কাজ নয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষাকরা শিক্ষকদের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে শিক্ষাথীরা যদি শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোন কাজ করে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহনের এখতিয়ার রয়েছে। তাই বিধিবিধান অনুসারে অরিত্রির ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেন।এ বিষয়ে কার দ্বিমত থাকার কথা নয়।কারন নিয়ম কানুন উঠিয়ে দিলে কোন প্রতিষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে চলতে পারে না।
school
অরিতী অধিকারী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শাখার নবম শ্রেণির ছাত্রী
আমরা দেখলাম যে এ ঘটনায় একজন শিক্ষক ইতোমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে।আমি বলছিনা সকল শিক্ষকই ধোয়া তুলসীপাতা। কোন শিক্ষকরা যদি অসৌজন্যমূলক বা অপমানজনক আচরন করে থাকে এবং তদন্তে তার প্রমান পাওয়া যায় তবে অবশ্যই তার আইনানুগ বিচার হওয়া উচিত।কিন্তু তদন্তের পূবেই একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা ও কোন বিবেকবান মানুষের কাজ নয়।
অভিযোগ উঠেছিল প্রিন্সিপালের কাছে হাত, পা ধরার পরও তিনি নাকি বিদ্যালয় পরিত্যাগের ছাড়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তেে অনড় ছিলেন।এমনকি ঐ শিক্ষার্থী প্রিন্সিপালের কাছে পা ধরে মাফ চেয়েছে বলে ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রচার করা হয়। কিন্তু প্রিন্সিপালের কক্ষের সিসি টিভি ফুটেজে এমন অভিযেগের কোন সত্যতা পাওয়া যায় না। ভিডিও ফুটেজে এ ধরনের কোন চিত্রই দৃশ্যমান হয় নি।তাই অধিকতর তদন্ত ব্যতিরেকে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগের উপর নির্ভর করে কোন সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়াসুবিবেচনা প্রসূত কাজ হবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর পর থেকেই অভিভাবকরা একটা বিষয় ভালোভাবেই সন্তানদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয় যে তাকে জিপিএ ৫ পেতেই হবে বা প্রথম,দ্বিতীয় হতেই হবে। এমন সব চ্যালেঞ্জ যখন তাদের সামনে দাড় করিয়ে দেওয়া হয় তখন কোমলমতি অনেক শিক্ষার্থীই প্রকৃত শিক্ষার রস আস্বাদন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বরং তারা তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায় শর্টকাট যে কোন উপায় অবলম্বন করে পরীক্ষায়  জিপিএ ৫ পেতে বা প্রথয়, দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করতে।আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও অনেকাংশেই দায়ী শিক্ষার্থীদের এমন সব অসদুপায় বেছে নেওয়ার পিছনে।কারন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন কোয়ালিটির(মান) চাইতে কোয়ানটিটি(সংখ্যা) কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।পরীক্ষা নির্ভর হয়ে গেছে শিক্ষাটা।তাই জিপিএ ৫ বা পাশের হার তরতর করে বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার গুনগতমান উন্নয়ন হচ্ছে না।
আপাত দৃষ্টিতে শুধু শিক্ষকরা অরিত্রির এই আত্মহত্যার পেছনে দায়ী মনে হলেও মূলত এর পিছনে অভিভাবক, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে আমাদের সমাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ধ্বস প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকাংশে ভূমিকা রাখছে। তথাকথিত অনেক নামী স্কুল কলেজের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনেক সময় অভিভাবকদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ন আচারনের অভিযোগ পাওয়া যায়। এই ধরনের আচরণ করার সুযোগ পাওয়ার পেছনেও অভিভাবকরাই দায়ী।কারন আমাদের অভিভাবকরা এসব স্কুলে সন্তান ভর্তি করানোর জন্য ঐ স্কুলের শিক্ষকদের দ্বারা কোচিং করানো,টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র কেনা,ভর্তির সময় ডোনেশন নামক ঘুষ দেওয়া থেকে শুরু করে এহেন কোন কাজ নাই যে অনেকে করে না। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির শুরুতেই যখন অভিভাবকদের এতসব অসদুপায় অবলম্বন করাতে দেখে তখন এমন অসৎ পন্থা অবলম্বনের প্রাথমিক শিক্ষাটা অভিভাবকদের কাছ থেকেই পেয়ে যায়।
এখন শিক্ষকদের অসৌজন্যমূলক আচারণ নিয়ে এত কিছু হচ্ছে।কারন একটা কোমলমতি শিক্ষার্থীর প্রাণ অকালে ঝরে গেছে।কিন্তু ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন অভিভাবকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয় তখন তারা সকলে এসবের প্রতিবাদ না করে এর সাথেই গাঁটছড়া বাঁধে। কিন্তু তখন যদি অভিভাবকরা প্রতিবাদেে সোচ্চার হয় তাহলে শিক্ষরা এমন অসৌজন্যমূলক আচরণের সুযোগ পেত না আর শিক্ষার্থীরা ও অসদুপায় অবলম্বনের শিক্ষাটা অভিভাবকদের থেকে পেত না।
Beautiful child little girl kid enjoys smartphone. Model Elizabeth Andreevaনবম শ্রেনী পড়ুয়া শিক্ষার হাতে স্মার্টফোন ছাড়াটাও অভিভাবকের বিবেচনা প্রসূত কাজ নয়।আর যদি তাদের অগোচরে ব্যবহার করে থাকে তাহলে বলতে হবে অভিভাবকের অসচেতনতার ফলেই অরিত্রি  পরীক্ষার হলে স্মার্টফোন নিতে পেরেছে।তারা সচেতনতার সহিত যদি অরিত্রির প্রতি ও তার লেখাপড়ার প্রতি  খেয়াল রাখতো তাহলে হয়তো তাকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে না।সন্তান কতটুকু পড়াশুনা করছে কি না, কতটা শিখছে এই বিষয়গুলো যদি তারা সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে দেখভাল করতো তবে মেয়েটি স্মার্টফোনের উপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়াশুনার উপরই ভর করে পরীক্ষার হলে যেত।তাই অভিভাবক এক্ষেত্রে কোনভাবে তার দায় এড়াতে পারে না।
আমাদের আরও একটা বিষয় অধিকতর খতিয়ে দেখার দাবি রাখে যে বসায় ফেরার পর মেয়েটির পিতা-মাতা তার পাশে দাড়িয়েছে নাকি তারাও তাকে এমনভাবে দোষারোপ করে চাপ সৃষ্টি করেছে যে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে। একটা সময় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বেতের প্রচলন ছিল।তখন আরে অনেক বেশি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ও অপমানের স্বীকার হতো শিক্ষার্থী। কিন্তু তখন আত্মহত্যার প্রবনতা এত বেশি ছিল না। তাই শুধু মাত্র একটি বিষয় এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিতে অরিত্রিকে বাধ্য করেছে ভাবাটা বুদ্ধিমানের পরিচয় হবে না বলে আমি মনে করি।মূলত আমাদের সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থারই বিপর্যয় ও ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন মর্মান্তিক এই ঘটনাটি।
বস্তুতপক্ষে আমাদের সংস্কৃতিই হয়ে গেছে যে আমরা শুধু যেকোন বিষয়কে খালি চোখে দেখি এবং শুধু ঘটনার উপরিভাগ বিশ্লেষণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরি।কিন্তু ঘটনার পেছনের ঘটনা, অন্তর্নিহিত কারণ এবং পরোক্ষ নিয়ামকগুলে বোঝার বা খোঁজার কোন চেষ্টাই করি না।আবেগ দিয়ে হয়তো তাৎক্ষণিক সোশাল মিডিয়ায় ঝড় তোলা যায় কিন্তু সমস্যার মূলে পৌছে বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবভিত্তিক প্রতিকার করা যায় না। ঘটনার মূল নিয়ামকগুলো উদঘাটন না করতে পারলে হয়তো আপাত দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপের দ্বারা অন্য নতুন ঘটনার আড়ালে চলে যাবে এই বিষয়টিও। তাই এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে কোন একটা ঘটনা বা পক্ষকে ঢালাওভাবে দায় চাপিয়ে দিলে প্রকৃত অর্থে জড়িত অনেকগুলে বিষয় বরাবরের মত এবারও লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাবে এবং দিনের পর দিন সমাজকে যে কুঁড়ে কুঁড়ে আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে সেটা বলাই বাহুল্য।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here