বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানরা কী পড়ে, কী শিখছে, তাঁদের শিক্ষকরাই বা কেমন? এমন অনেক কথাই অভিভাবকদের মনে জাগে। কিন্তু কয়জন অভিভাবকই বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে এসব খোঁজ-খবর নিতে পারেন? ফলে জানা ও দেখার ইচ্ছে তাঁদের থেকেই যায়।অভিভাবকদের এমন ইচ্ছে পূরণ বা বলতে গেলে দায়বদ্ধতার সেই জায়গা থেকে এমন মহতি ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ডিসিপ্লিনের প্রধানের নেতৃত্বে শিক্ষকবৃন্দ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে সব অভিভাবকদের উপস্থিতিতেই তাঁদের সন্তানদের উপস্থাপনা প্রত্যক্ষ করা ছাড়াও অভিভাবকদের সাথে প্রতিষ্ঠান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সকল শিক্ষকের সাথে কথা বলার ও শোনার সুযোগ হয় এমন এক আয়োজন করা হয় গতকাল ৫ ডিসেম্বর। আইন ডিসিপ্লিন আয়োজিত এ ব্যতিক্রমর্ধী অনুষ্ঠানটি ছিলো ১৮ ব্যাচের টার্ম রিভিউ অনুষ্ঠান।

ভর্তি হওয়ার পর এক বছরে ২টি টার্ম পার করছে আইন ডিসিপ্লিনের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীরা। দ্বিতীয় টার্মের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই এ আয়োজন। স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের মিলনায়তন উঠানে আয়োজিত এ টার্মরিভিউ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য এক বছরে আইনের শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, কী দেখেছে, কেমন পরিবেশে লেখাপড়া করছে, প্রত্যেকের পারফর্মেন্স কেমন, মানসিক অবস্থা ও ভাবনা কী-এমন অনেক কিছু।

আমন্ত্রিত অভিভাবকরা কেউ এসেছিলেন সদূর বগুড়া, বরিশাল, যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন যাঁরা পরে এসেছেন লুঙ্গি স্যান্ডেল। এমন সাধারণ খেঁটে খাওয়া কৃষক, কর্মজীবী একেবারে গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে আসা সন্তানের অভিভাবকও ছিলেন। অভিভাবকদের মধ্যে ছিলেন নানা পেশার। তাদের বেশিরভাগই জীবনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা রাখেননি, স্বপ্নেও ভাবেননি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এতোটা সম্মানিত হবেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ডিসিপ্লিনের প্রধানের নেতৃত্বে শিক্ষকবৃন্দ ডিসিপ্লিনের ব্যতিক্রমধর্মী টার্ম রিভিউ দেখে অভিভূত অভিভাবকরা

কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তাঁরা খুবই সম্মানিত ও সৌভাগ্যবান বলে মনে করেন। যখন তাঁদের সামনেই তাঁদের সন্তানরা স্মার্টভাবে কথা বলছিলো, অভিভাবকদের আশ্বাস দিচ্ছিলো যে, এখানে তাঁরা পিতা-মাতার মতোই শিক্ষক অভিভাবক পেয়েছেন, যখন বলছিলো আমরা খুব ভালো আছি, আমরা আত্মপ্রত্যয়ী। ভবিষ্যতে এখান থেকে পাস করে বিচারপতি হবো, জজ হবো, ব্যারিস্টার হবো, আইনজীবী হবো তখন অভিভাবকরা আনন্দাশ্রু ঠেকাতে পারেননি। তাঁরা তাঁদের জীবনের নতুন স্বপ্ন দেখতে পেলেন। এ অনুষ্ঠান তাদের জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন অনেক অভিভাবক।

সন্তানরাও তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। ৪০ জন শিক্ষার্থীর প্রায় সবার বক্তব্য ছিলো আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ডিসিপ্লিনে ভর্তি হয়ে গত এক বছরের শিক্ষাকার্যক্রমে এমন শিক্ষক পেয়েছি তাঁরা পিতা-মাতার মতো, অভিভাবকের মতো। ফলে পুরো ডিসিপ্লিনটাই একটা পরিবার হয়ে গেছে। ক্লাসের লেখাপড়ার পাশাপাশি শিষ্টাচার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসুলভ আচরণ ও নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগদানের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন আত্মপ্রত্যায়ী করে। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভালো কিছু করার জন্য।

তারা মাদক ও সন্ত্রাসকে না বলেছে, প্রযুক্তি আসক্তিকে উপেক্ষা করেছে, অলসতাকে বিসর্জন দিয়েছে, উদ্যম আর সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। আইন স্কুলের ডিন ও আইন ডিসিপ্লিন প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ ওয়ালিউল হাসানাতের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সহকারী অধ্যাপক তালুকদার রাসেল মাহমুদ। এর পর ডিসিপ্লিনের ৪০ জন শিক্ষার্থী সংক্ষিপ্তভাবে একে একে তাদের অভিজ্ঞতা আর অভিব্যক্তি প্রকাশ করে।

ব্যতিক্রর্মী এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান নিজেই আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন অভিভাবকদেরকে এমন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হয়, তাঁদের সম্মানিত করা হয় এবং তাঁদের সামনেই তাঁদের সন্তানদের পারফর্মেন্স তুলে ধরা হয় এমন আয়োজন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় কি না তা জানা নেই। তিনি বলেন এই অনুষ্ঠান একটি মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে যেখানে অভিভাবকরাই সবচেয়ে খুশি হবেন তাঁদের সন্তানদের অগ্রগতি দেখতে পেয়ে এবং সেটাই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন দেশের বেশির ভাগ অভিভাবক সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আর খবর রাখেন না। সন্তানদের কথার ওপরই নির্ভর করেন। তাদের ভালো-মন্দ জানতে পারেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক শিক্ষার্থী বিপথগামী হয়ে পড়ে। তিনি অভিভাবকদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া সন্তানের খোঁজ-খবর রাখার পরামর্শ দেন এবং শিক্ষার্থীদেরকে উপদেশ দেন যে, তাঁরা যেনো ফেসবুক মোবাইলে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় না করে, বরং অভিভাবকদের সাথে, পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে, পিতা-মাতার খোঁজ-খবর নেয়।

তিনি আরও বলেন যেসব শিক্ষার্থী পিতামাতার খোঁজ-খবর রাখে, পরিবারের খবর রাখে, যাঁরা শিকড়কে ভুলে না যায় তারা দেশপ্রেমী নাগরিক হয়। তিনি বলেন লেখাপড়া শিখে তাঁরা যে যে পেশাতেই যাক না কেনো তাঁরা যেনো দেশমাতৃকাকে না ভোলে, তারা যেনো পিতামাতাকে, পরিবারকে না ভোলে কারণ, তাঁদের লেখাপড়ার পেছনে তাঁদের পরিবার ও এই দেশের সাধারণ মানুষের অবদান রয়েছে। এই দেশ স্বাধীন না হলে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় হতো না এবং এখানে তারা পড়ার সুযোগ পেতো না।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ছাত্রবিষয়ক পরিচালক প্রফেসর মোঃ শরীফ হাসান লিমন ও এ্যাডভোকেট শাহনেওয়াজ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনের ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ফারিয়া ও সুস্মিত। পরে শার্লি ইসলাম লাইব্রেরিতে ১৭ ব্যাচের উদ্যোগে কালচারাল ফেস্ট অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত কালচারাল ফেস্ট অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ও গান পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর সাধন রঞ্জন ঘোষ।

এছাড়া উভয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহণ করে। এ সময় সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here