jute bangladesh
পাট
অতীতে দেশের প্রধান রফতানি খাত ছিল পাট ও পাটপণ্য। যদিও বর্তমানে খাতটি চলছে খুঁড়িয়ে। একসময় এ খাতে খুলনা জেলার পাটকলগুলোর অবদান ছিল যথেষ্ট।সাম্প্রতিক সময়ে এখানকার বেসরকারি পাটকলগুলোর মুনাফায় ধারাবাহিকতা দেখা গেলেও সার্বিক খাতের জন্য তা আশাব্যঞ্জক নয়।
কারণ অব্যাহত লোকসানের মুখে রয়েছে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো।খুলনার সরকারি পাটকলগুলোর ত্রাহি অবস্থা। টাকার অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে একাধিক সরকারি পাটকল। যদিও গত ৫ বছরে এ খাতে সরকারের পক্ষ থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। তারপরও সরকারের কাছে আবারো ৪শ কোটি টাকা চেয়েছে সরকারি পাটকল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। বর্তমানে টাকার অভাবে পাটকলগুলো কাঁচা পাট কিনতে পারছে না। একই সাথে নিয়মিতভাবে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি মালিকানাধী পাটকলগুলো চলছে ধারদেনা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ইপিআইডিসির ৬৭টি পাটকল তদারক, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিজেএমসি গঠিত হয়। পরে আরো পাটকল সরকারি করে বিজেএমসির আওতায় আনা হয় মোট ৮২টি পাটকল। কিন্তু ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ৪৩টি পাটকলকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পর সরকারের হাতে থাকে মাত্র ৩৮টি পাটকল।
কিন্তু ১৯৯৩ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে পাট খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় আরো ১১টি পাটকল বন্ধ করে দেয়ায় বর্তমানে সরকারের হাতে মাত্র ২৬টি পাটকল
গত ৫ বছরে সরকারি পাটকলগুলোয় ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েও আশানরূপ উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। এখন আবারো টাকার জন্য সরকারের কাছে ধর্না দিতে হচ্ছে বিজেএমসি। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৬০৫ টন পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছিল ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১৮ হাজার ৭৭৬ টন পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গতবছর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোনোভাবেই রফতানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি কমেছে ২০ শতাংশেরও বেশি। এসময়ে ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকার পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তার ২৮ শতাংশও পূরণ করা যায়নি। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রফতানি কমেছে কাঁচা পাট ৬১ শতাংশ, পাটের সুতা ২৩ শতাংশ ও অন্যান্য পাটজাত পণ্য ৫৪ শতাংশ।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো(ইপিবি)খুলনা শাখার হিসাব মতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশই ছিল পাটের অবদান, যা বর্তমানে ২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানি আয়ে পাটের অবদান মাত্র ৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার।
ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, দলাদলি, সময়মতো কাঁচা পাট কিনতে ব্যর্থ হওয়া, প্রয়োজনের অধিক জনবল, সিবিএর দৌরাত্ম্য, পুরনো মেশিন ও দুর্নীতির কারণেই সরকারি পাটকলগুলো লোকসানে চলে গেছে। অন্যদিকে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, দ্রুততার সঙ্গে উত্পাদিত পাটপণ্য বিক্রি করতে পারা, কাঁচামালের পর্যাপ্ত সরবরাহসহ দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে লাভবান হচ্ছে জেলার বেসরকারি পাটকলগুলো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে সাত লাখ আট হাজার হেক্টর জমিতে ৮৩ লাখ ৯৬ হাজার বেল পাট উৎপাদন হয়। এর পরের বছরগুলোতে চাষের এলাকা এবং ফলন দুটোই কমতে কমতে চলতি অর্থবছরে ছয় লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে ৭৪ লাখ ৩৬ হাজার বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এর পরিমাণ আরো কমবে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি প্রায় সাত হাজার কোটি টাকায় ছুঁয়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা কমে পাঁচ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জুন নাগাদ তা বড়জোর সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক শাখা সূত্রে জানা যায়।
খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ২০০ কোটি টাকারও বেশি পণ্য অবিক্রীত পড়ে আছে। বাকিতে বিক্রি করেও টাকা ওঠাতে পারছে না এসব মিল। ফলে শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মজুরি-বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি না পাওয়ায় এ অঞ্চলের নয়টি পাটকলে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিকরা। এছাড়া ১১ দফা দাবিতে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সারা দেশের বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন ২৬টি জুট-নন জুট মিলে প্রায়ই ধর্মঘট কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সূত্র জানায়, খুলনা-যশোরের নয় পাটকলে ২১ হাজার ৪৭৪ টন পাটজাত পণ্য পড়ে আছে। এর মধ্যে হেসিয়ান ৩ হাজার ৩৫৩ টন, স্যাকিং ১২ হাজার ৩৩৬ টন, সিবিসি ৫ হাজার ৩৮ টন ও ইয়ার্ন ৭৪৮ টন। হেসিয়ানের বর্তমান বাজারদর টনপ্রতি ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা, স্যাকিং ৭৭ হাজার ও সিবিসি ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) খুলনা অঞ্চলের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা গাজী শাহাদাত হোসেন বলেন, পাটকলে ২০০ কোটি টাকারও বেশি পণ্য অবিক্রীত পড়ে থাকায় অর্থ সংকটে পড়েছে মিলগুলো। তবে অর্থ জোগানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকল্প প্রধান আবুল কালাম হাজারী বলেন, প্রতিনিয়তই শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু নেতারা জানিয়েছেন, এখন আর আন্দোলন তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে বিজেএমসি থেকে বলা হচ্ছে, বিক্রীত পণ্যের টাকা শিগগিরই পাওয়া যাবে। পণ্য বিক্রির টাকা পাওয়া গেলেই কিছু মজুরি-বেতন দেয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেএমসির আঞ্চলিক শাখার এক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের অবস্থা পরিবর্তনে অবশ্যই সরকারকে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে। বছরে দেশের ২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়। অথচ যে পণ্য উত্পাদন হয়, তা দিয়ে আয় হয় সর্বোচ্চ ৬০০ কোটি টাকা। বাকি ৬০০ কোটি টাকাই ভর্তুকি দিতে হয়। এছাড়া যথাসময়ে পাট কেনার টাকা পরিশোধ ও পুরনো মেশিনারিজ সংস্কারসহ পাটকল রক্ষায় অনেক পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজেএমসি আঞ্চলিক শাখা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫২ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে খুলনায় ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলিম ও ইস্টার্ন এবং যশোরে জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিল গড়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও মিলগুলোর যন্ত্রপাতি বিএমআরই বা সংস্কার করা হয়নি। এর ফলে পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতির অবস্থা নাজুক। বিশেষ করে স্পিনিং, সফট্নার, ব্রেকার ও ফিনিশার কার্ড, ড্রয়িং মেশিনের অবস্থা বেহাল।
সূত্রটি জানায়, গত বছর প্রতিদিন ৩৭২ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হতো ২২৮ টন। আর এখন প্রতিদিন ২৭২ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৮৩ টন। এছাড়া পাঁচ হাজার ১১৪টি তাঁতের মধ্যে এখন চালু আছে মাত্র দুই হাজার ৮শ’ টি।খুলনা অঞ্চলের নয়টি পাটকলে বর্তমানে ২৬ হাজার ৭১৮ জন শ্রমিক কাজ করেন।স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এসব মিলগুলোতে প্রায়  অর্ধ লক্ষ শ্রমিক কাজ করতো।
খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল বছরে গড়ে লোকসান দিচ্ছে প্রায় ২২০ কোটি টাকাবিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, এই লোকসানের পেছনে তারা সাতটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত স্থায়ী শ্রমিক, সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন না হওয়া, ব্যাংক ঋণের সুদ, সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা, শ্রমিক আন্দোলন ও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিবিএ নেতাদের কাজ না করা।
এ ব্যাপারে ক্রিসেন্ট জুট মিল সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন বলেন, মিলগুলো পাটের ভরা মওসুমে প্রয়োজনীয় কাঁচা পাট কিনতে পারছে না। ফলে পরবর্তীতে মণ প্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বেশী দামে পাট কিনতে হচ্ছে। এর ফলে মিলগুলোকে লোকসান গুণতে হচ্ছে। অথচ লোকসানের দায় চাপানো হচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। আমরা বারবার বলে আসছি, পাটের মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে বাজারদর অনুযায়ী পাট কেনা হোক।
কিন্তু বিজেএমসি পাট কেনে না। সেই পাট যখন কৃষকের কাছ থেকে শিপারদের কাছে চলে যায়, তখন দাম বাড়ে। আর তখনই পাট কেনা শুরু করে বিজেএমসি। মূলত বিজেএমসির কিছু অসাধু কর্মকর্তার কৌশলের কারণে এমনটা হচ্ছে। তাঁরা নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া ও পাটকলগুলো ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here